thereport24.com
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬,  ১৩ রবিউস সানি 1441

রেল দুর্ঘটনার যত কারণ

২০১৯ নভেম্বর ১২ ২০:০৭:২৯
রেল দুর্ঘটনার যত কারণ

দ্য রিপোর্ট প্রতিবেদক: একের পর এক দুর্ঘটনায় ‘নিরাপদ বাহন’ ট্রেন এখন অনিরাপদ বাহনে পরিণত হয়েছে। গত সাড়ে ৫ বছরেই এক হাজার ৮টির বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছেন ১৩০ জন। গবেষকরা বলছেন, কর্তৃপক্ষের যথাযথ নজরদারি না থাকায় প্রতিরোধযোগ্য এসব দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। আর রেল কর্তৃপক্ষ বলছে, দুর্ঘটনা রোধে রেলের অনেক বিধিবিধান রয়েছে, সেগুলো মানা হয় না বলেই বাড়ছে দুর্ঘটনা।

পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাষ্ট্রীয় সেবা প্রতিষ্ঠান হিসেবে রেলওয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থায় একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে ভূমিকা রাখছে। পরিবেশ দূষণরোধ, যাতায়াত নিরাপত্তা, স্বল্প খরচে মালামাল পরিবহন, ভূমির পরিমিত ব্যবহার, যানজট নিয়ন্ত্রণ এবং সর্বোপরি নগরের সঙ্গে গ্রামের সেতুবন্ধনে রেলের গুরুত্ব অনেক। এছাড়া যোগাযোগ ব্যবস্থায় রেলওয়েকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। উন্নয়ন বাজেটও অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এর পরেও তেমন কোনও সুফল মিলছে না। একের পর এক স্টেশন বন্ধ, মেয়াদোত্তীর্ণ রোলিং স্টক, জরাজীর্ণ রেল কারখানা, লোকবল সংকট, সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারা, টিকিট পেতে ভোগান্তি, ছেঁড়া ও নোংরা আসনসহ নানা অব্যবস্থাপনা লেগেই আছে।

ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ (ডিব্লিউবিবি) ট্রাস্টের এক গবেষণায় দেখা গেছে- মুখোমুখি সংঘর্ষ, ট্রেন বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া, লেভেল ক্রসিং, সিগনালিং ত্রুটি, লাইনচ্যুতিসহ নানা কারণে রেলপথে ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটছে। দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে লাইনচ্যুতির ৭৫ শতাংশই ঘটছে রেললাইনের কারণে। এর অন্যতম কারণ যন্ত্রাংশের সংকট ও রেলপথের যন্ত্রপাতি চুরি। পাশাপাশি রেলওয়ের সংশ্লিষ্টদের অবহেলা, লোকবল ঘাটতি, নিয়মিত তদারকি ও মেরামতের অভাব, রেলপথে মানসম্মত পর্যাপ্ত পাথরের স্বল্পতা ও ঝুঁকিপূর্ণ সেতুর কারণেও ঘটছে দুর্ঘটনা।

রেল দুর্ঘটনার চিত্র: ডব্লিউবিবি ট্রাস্টের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১০ সালের পর থেকে রেলে দুর্ঘটনার সংখ্যা বাড়তে থাকে। এটি ২০১৩ সালের জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মারাত্মক আকার ধারণ করে। ওই বছর থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত রেলওয়েতে এক হাজার ৮টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। সেসব দুর্ঘটনায় ২৯৫জন আহত হওয়ার পাশাপাশি ১১৫ জন নিহত হয়েছেন। এরপর ২৩ জুন মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় উপবন এক্সপ্রেস লাইনচ্যুত হয়ে আরও চার জন নিহত হন। সর্বশেষ সোমবার দিবাগত রাত ৩টায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার মন্দবাগে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী তূর্ণা নিশীথা ও সিলেট থেকে চট্টগ্রামগামী উদয়ন এক্সপ্রেস ট্রেন দুটির মধ্যে সংঘর্ষের এ ঘটনা ঘটে। এতে ১৬ জন ট্রেনযাত্রী নিহত হয়েছেন।

(দ্য রিপোর্ট/আরজেড/নভেম্বর ১২,২০১৯)

অপরদিকে, রেল কর্তৃপক্ষের হিসাব বলছে, শুধু ২০১৪ থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ৮৬৮টি দুর্ঘটনায় ১১১ জন নিহত হয়েছেন। আর আহত হয়েছেন ২৯৮ জন। এতে রেলের ক্ষতি হয়েছে এক হাজার কোটি টাকারও বেশি। বেসরকারি হিসাবে এর পরিমাণ আরও বেশি।

বর্তমানে রেললাইনের অবস্থা: বর্তমানে সারাদেশে দুই হাজার ৯২৯ কিলোমিটার রেললাইন রয়েছে। এর মধ্যে মানসম্পন্ন রেললাইন মাত্র ৭৩৯ কিলোমিটার। যা মোট রেললাইনের ২৫ দশমিক ২৩ শতাংশ। ডব্লিউবিবি ট্রাস্টের গবেষণায় দেখা গেছে রেল কর্তৃপক্ষ ১৪টি রুটকে মানসম্পন্ন বলে চিহ্নিত করেছে।

সিগনালিং ত্রুটি: রেল দুর্ঘটনায় পড়ার অন্যতম কারণ সিগনাল অমান্য করা বা সিগনালিং ত্রুটি। কোনও কারণে যদি সিগনালে ত্রুটি দেখা দেয় কিংবা চালক অমান্য করেন তাহলে অনেকক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ঘটে। সর্বশেষ ঘটে যাওয়া কসবা দুর্ঘটনা সিগনাল অমান্যের কারণেই হয়েছে বলে মনে করছে রেল কর্তৃপক্ষ।

ঝুঁকিপূর্ণ রেল ক্রসিং: রেলপথের ওপরে ক্রসিং থাকা ঝুঁকিপূর্ণ হলেও যোগাযোগের প্রয়োজনেই অনেক সময় তা করতে হয়। তবে কোনও স্থানে নতুন রেললাইন নির্মাণ করলে প্রয়োজনে লেভেল ক্রসিং নির্মাণ করে সেখানে গেটকিপার নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু দেশে এখনো দুই হাজার ৩১টি ঝুঁকিপূর্ণ রেলক্রসিং রয়েছে। সেসব স্থানে কোনও গেটকিপার নেই।

অতিরিক্ত বগি সংযোজন: রেল দুর্ঘটনার অন্যতম আরও একটি কারণ হচ্ছে ক্ষমতার অতিরিক্ত বগি স্থাপন করা। যে কারণে অনেক সময় বগি লাইনচ্যুত হয়ে দুর্ঘটনা ঘটে।

রেললাইনে পাথরের স্বল্পতা: নিরাপদ ট্রেন পরিচালনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রেলপথে পাথরের আধিক্য। পর্যাপ্ত পাথর থাকলে গতিবেগ বাড়লেও ট্রেনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমে যায়। তবে সম্প্রতি রেলপথে পাথরের পরিমাণ কমে এসেছে। রেললাইন রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রতিবছর পাঁচ লাখ ৫৬ হাজার ঘনফুট ক্রাশড স্টোন বা চূর্ণ পাথর প্রয়োজন হলেও পাওয়া যাচ্ছে মাত্র এক লাখ ঘনফুট পাথর। আর যেসব পাথর ব্যবহার করা হচ্ছে সেগুলোও নিন্মমানের বলে অভিযোগ রয়েছে।

নড়বড়ে ট্র্যাক: দেশে রেলপথ বাড়লেও দীর্ঘদিনের পুরনো লাইনগুলো ঠিকমতো সংস্কার না করায় রেল দুর্ঘটনা বাড়ছে। রেলের উন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্প নেওয়া হলেও স্লিপার, ফিশপ্লেটসহ বিভিন্ন উপকরণ নিম্নমানের ব্যবহার হওয়ায় দ্রতগতির ট্রেন চলায় ব্যাঘাত ঘটছে।

ঝুঁকিপূর্ণ রেলসেতু: দেশে বর্তমানে রেলপথে ছোট-বড় তিন হাজার ১৪৩টি কালভার্ট ব্রিজ রয়েছে। এরমধ্যে ৩২৬টি বড় সেতু (৬০ ফুট বা তার বেশি) ও দুই হাজার ৮১৭টি ছোট সেতু রয়েছে। এর অধিকাংশই ব্রিটিশ আমলের। সেতুগুলো সংস্কার না করায় এরইমধ্যে ৪০২টি সেতু ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। ফলে মাঝে মধ্যে ব্রিজ ভেঙে, কিংবা স্লিপার না থাকায় লাইনচ্যুত হয়ে রেল দুর্ঘটনা হচ্ছে।

আধুনিক প্রযুক্তির অভাব: রেল দুর্ঘটনা রোধে নানা প্রযুক্তি আবিষ্কার হলেও দেশে এখনও তার ব্যবহার হচ্ছে না। তবে পাশের দেশ ভারত ট্রেনের মুখোমুখি দুর্ঘটনা রোধে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। দেশটির রেললাইনে দুটি ট্রেন মুখোমুখি চলে আসলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্রেন বন্ধ হয়ে যায়।

লোকবল সংকট: রেলে এখনও অভিজ্ঞ লোকো পাইলটের অভাব রয়েছে। এই ঘাটতির কারণে নতুন যারা আছে তাদের পর্যাপ্ত ট্রেনিং না দিয়ে চালকের আসনে বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অভিজ্ঞ চালক সংকটের কারণে অনেকক্ষেত্রে তাদের অতিরিক্ত ডিউটি করতে হচ্ছে। যে কারণে ক্লান্ত চালকদের মাধ্যমে দুর্ঘটনা ঘটছে।

বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য: জানতে চাইলে রেল গবেষক ও ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ (ডব্লিউবিবি) ট্রাস্টের প্রকল্প কর্মকর্তা মো. আতিকুর রহমান বলেন, আমাদের দেশে নানা কারণে ট্রেনের দুর্ঘটনা ঘটে। প্রযুক্তির মাধ্যমে এসব দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব। কিন্তু আমাদের রেল সেই সক্ষমতা অর্জন করেনি। এ জন্য কর্তৃপক্ষের স্বদিচ্ছাও নেই।

তিনি আরও বলেন, ‘দুর্ঘটনা রোধে রেল কর্তৃপক্ষ রেলের গতি কমানো ও উদ্ধার কাজে ব্যবহারের জন্য ক্রেনকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এ ধরণের চিন্তা থেকে রেলকে বেরিয়ে আসতে হবে।’

রেলওয়ে পুলিশ বা আনসার বাহিনীকে প্রশিক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা, রেলওয়ে হাসপাতাল এবং ডাক্তারদের এ ধরনের দুর্ঘটনা মোকাবিলায় সক্রিয় করা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

জানতে চাইলে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, আমাদের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় সরকারের আন্তরিকতার ঘাটতি রয়েছে। রেললাইনের স্লিপার আটকানোর ক্ষেত্রে যে বাঁশনির্ভরতার সৃষ্টি হয়েছে তাও আমরা দেখেছি। এই পরিস্থিতিতে রেল বিভাগের দুর্নীতি কঠোরভাবে দমনের মাধ্যমে সারাদেশের পুরাতন জরাজীর্ণ রেলব্রিজ ও রেলপথ পুনর্নির্মাণ এবং সংস্কার করে একটি নিরাপদ-জনবান্ধব সাশ্রয়ী রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।’ পূর্বের দুর্ঘটনাগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের যথাযথ শাস্তি হয়নি বলেই রেল দুর্ঘটনা বাড়ছে বলে মনে করেন তিনি।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য: রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) মো. মিয়া জাহান বলেন, দুর্ঘটনা রোধে রেলওয়ের অনেক বিধিবিধান রয়েছে। তাতে কোন সময়, কী করতে হবে তার বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। সেই বিধিবিধানগুলো মানা হয় না বলেই দুর্ঘটনা ঘটছে। যথাযথভাবে বিধিবিধানগুলো মানা হলে আর দুর্ঘটনা ঘটবে না।

(দ্য রিপোর্ট/আরজেড/নভেম্বর ১২,২০১৯)

পাঠকের মতামত:

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

SMS Alert

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর