thereport24.com
ঢাকা, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১০ আশ্বিন ১৪২৭,  ৭ সফর 1442

ঢাকা মেডিকেলে প্লাজমা দিয়েছেন করোনাজয়ী দুই চিকিৎসক

২০২০ মে ১৭ ০৯:৫৮:২৬
ঢাকা মেডিকেলে প্লাজমা দিয়েছেন করোনাজয়ী দুই চিকিৎসক

দ্য রিপোর্ট প্রতিবেদক: করোনাভাইরাসের চিকিৎসায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হয়েছে প্লাজমা থেরাপির কার্যক্রম। শনিবার (১৬ মে) করোনামুক্ত দুই চিকিৎসক প্লাজমা দিয়েছেন। আগামী সপ্তাহে সেটি কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের ওপর প্রয়োগ করা হবে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের হেমাটোলজি বিভাগের প্রধান ও প্লাজমা থেরাপির জন্য গঠিত কমিটির প্রধান অধ্যাপক ডা. মহিউদ্দিন আহমেদ খান, যিনি অধ্যাপক এম এ খান নামেই সর্বাধিক পরিচিত।

শনিবার অধ্যাপক এম এ খান বলেন, আমরা আজ কোভিড-১৯ থেকে সুস্থ হয়ে ওঠা দুজন চিকিৎসকের শরীর থেকে প্লাজমা নিয়েছি, সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী সপ্তাহে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা কোভিড রোগীদের ওপর তা প্রয়োগ করা হবে। তিনি জানান, একজন সুস্থ হয়ে ওঠা মানুষ থেকে দুইজন আক্রান্ত মানুষকে প্লাজমা দেওয়া যাবে। তবে প্লাজমা থেরাপি কার্যক্রম চালিয়ে নিতে ডোনার পাওয়া এবং অর্থের ব্যবস্থা করা এই দুটো চ্যালেঞ্জ রয়েছে, জানান তিনি।

এম এ খান বলেন, শুরুতে ৪৫ জন রোগীকে এই প্লাজমা থেরাপি দেওয়া হবে, বাকি ৪৫ জনকে নেওয়া হবে যাদের ওপর প্রয়োগ হবে না। এই দুই গ্রুপকে পর্যবেক্ষণে রেখে তাদের মধ্যকার পার্থক্যটা বোঝা যাবে।

রক্তের তরল হলুদাভ অংশকে প্লাজমা বা রক্তরস বলা হয়। রক্তের মধ্যে তিন ধরনের কণিকা ছাড়া বাকি অংশই রক্তরস আর রক্তের প্রায় ৫৫ শতাংশই রক্তরস। প্লাজমা থেরাপিতে শতভাগ সাফল্য আসবে না উল্লেখ করে চিকিৎসকরা বলছেন, তবে যেহেতু কোভিড-১৯ এর কোনও চিকিৎসা এখনও নেই আর প্লাজমা থেরাপির কোনও ক্ষতি নেই তাই পরীক্ষামূলকভাবে এটা দিতে সমস্যা নেই।

অধ্যাপক ডা. এম এ খান বলেন, যারা প্লাজমা দিচ্ছেন তাদের ভয়ের কোনও কারণ নেই, তারা নিরাপদ থাকবেন। কোনও ধরনের রি-ইনফেকশন হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়ে যারা সুস্থ হয়েছেন তাদের প্রতি অনুরোধ, আপনার দেওয়া প্লাজমাতে সুস্থ হতে পারেন আরেকজন মানুষ। তাই সবাইকে এগিয়ে আসতে অনুরোধ করছি।

তিনি আরও বলেন, আজ তো শুরু হলো, প্লাজমা সংগ্রহ চলবে। সংগ্রহ করা প্লাজমাতে অ্যান্টিবডি পরিমাপ করা হবে। আর ইতোমধ্যেই এ সংক্রান্ত অনুমোদনের প্রক্রিয়াও শেষ হয়ে যাবে। ইতোমধ্যেই স্পেন থেকে এ সংক্রান্ত পরীক্ষার জন্য যন্ত্রপাতি চলে এসেছে বলেও জানান তিনি।

যারা প্লাজমা দেবেন তাদের প্লাজমা দেওয়ার আগে কিছু পরীক্ষা করাতে হয়, সেসব পরীক্ষা ব্যয়বহুল জানিয়ে এম এ খান বলেন, অনেকগুলো স্যাম্পল কালেক্ট করার পর একসঙ্গে এই পরীক্ষা করতে হবে, নয় তো কিট নষ্ট হবে। তবে পরীক্ষাটা যেহেতু আমরা আন্তর্জাতিক মানের করতে চাই, তাই সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েই আমরা শুরু করেছি।

নারীদের ক্ষেত্রে প্লাজমা দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, যেসব নারী মা হয়েছেন তারা প্লাজমা দিতে পারবেন না, তবে অবিবাহিত নারীরা দিতে পারবেন।

প্লাজমা থেরাপির কার্যক্রম হিসেবে প্রথম দিনে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে প্লাজমা দিয়েছেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. দিলদার হোসেন বাদল। গত ১৮ এপ্রিল লক্ষণ উপসর্গ দেখা দিলে তিনি ২৫ এপ্রিল পরীক্ষা করান এবং তাতে তিনি করোনা পজিটিভ বলে শনাক্ত হন। তারপর বাসাতেই চিকিৎসা নিয়েছেন। ৯ মে তিনি সুস্থ হন। আজ প্লাজমা দিয়ে এসে তিনি তার কর্মস্থল শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যোগদানও করেছেন, আগামীকাল থেকে যথারীতি আবার কাজে ফিরবেন।

ডা. দিলদার হোসেন বলেন, উন্নত বিশ্বের অনেক দেশে এই প্লাজমা থেরাপি সফলতার সঙ্গে কাজ করছে। আর কোভিড-১৯ এর এখনও কোনও চিকিৎসা নেই, তাই একটা ট্রিটমেন্ট অপশনের ডোর যদি ওপেন হয়। কিছু মানুষ যদি বেঁচে যায় সে কারণেই প্লাজমা দেওয়া। একজন মানুষের প্লাজমা দিয়ে দুজন মানুষকে সারভাইব করানো যদি সম্ভব হয়, যদি সবকিছু মিলে যায়, যদি একজন মানুষও আমার কারণে বেঁচে যায়, সেটাই জীবনের বড় পাওয়া।

প্লাজমা থেরাপি কিভাবে কাজ করে জানতে চাইলে চিকিৎসকরা বলছেন, কোভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা এ ভাইরাস মোকাবিলা করে টিকে থাকতে অ্যান্টিবডি তৈরি করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আক্রান্ত ব্যক্তির প্লাজমায় প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। ওই অ্যান্টিবডিই অসুস্থদের সারিয়ে তোলার জন্য ব্যবহার হবে। এটা একেবারেই রক্তদানের প্রক্রিয়ার মতো একটি প্রক্রিয়া, কেবল এখানে করোনাতে আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হতে হবে এটুকুই পার্থক্য। করোনা থেকে সুস্থ হওয়ার ১৪ দিন পর্যন্ত একজন ব্যক্তি প্লাজমা দিতে পারেন।

প্লাজমা দেওয়া আরেকজন চিকিৎসক হলেন কোভিড-১৯ থেকে সুস্থ হয়ে ওঠা স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ডা. রওনক জামিল পিয়াস। ডা. পিয়াস কোভিড আক্রান্ত হন গত ১৫ এপ্রিল, সুস্থ হয়ে ওঠেন গত পাঁচ মে। তিনিও বাসাতেই চিকিৎসা নিয়েছেন। আজকের দিনটি নিজের জন্য স্পেশাল জানিয়ে ডা. পিয়াস বলেন, ভীষণ ভালোলাগা কাজ করছে নিজের ভেতরে, আমার প্লাজমাতে কেউ বেঁচে যাবে—এ অনুভূতি আমাকে সারাজীবন অন্য ভালো কাজ করতে আরও উদ্বুদ্ধ করছে। ডা. পিয়াস বলেন, সাধারণ মানুষ যেন প্লাজমা দিতে এগিয়ে আসে, তারা এখনও এর সঙ্গে অভ্যস্ত নন। সাধারণ মানুষকে প্লাজমা দেওয়ার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমকে আরও কাজ করতে অনুরোধ করেন তিনি।

অধ্যাপক এম এ খান বলেন, হাসপাতালে ভর্তির পরপরই যেসব রোগীদের শ্বাসকষ্ট শুরু হবে তাদের যদি সঙ্গে সঙ্গে এক ব্যাগ বা ২০০ মিলিলিটার প্লাজমা দেওয়া যায় তাহলে তার অবস্থা খারাপের দিকে না গিয়ে ফল ভালো আসে। কারণ প্লাজমা শরীরের রক্তের মধ্যে যে ভাইরাস থাকে তাকে অকেজো করে দেয়। অ্যান্টিবডি তৈরি করে ভাইরাসের বিপক্ষে।

গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএ (ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) প্লাজমা থেরাপি অনুমোদন দেওয়ার পর অধ্যাপক ডা. মহিউদ্দিন এ উদ্যোগ নেন। স্বাস্থ্য অধিদফতরকে জানানো হলে, ১২ এপ্রিল এ নিয়ে বৈঠক হয়। ১৮ এপ্রিল তাকে প্রধান করে চার সদস্যের টেকনিক্যাল সাব কমিটি গঠন করে স্বাস্থ্য অধিদফতর। বাকি তিন সদস্য হলেন ঢামেক হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবির এবং ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মাজহারুল হক তপন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সি।

(দ্য রিপোর্ট/আরজেড/১৭মে, ২০২০)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর